ঢাকারবিবার , ১৫ আগস্ট ২০২১
  1. অর্থনীতি
  2. আইটি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. দিরাই শাল্লার খবর
  7. ধর্ম
  8. প্রবাস
  9. বিনোদন
  10. মুক্ত মতামত
  11. মুক্তমত
  12. মৌলভীবাজার
  13. রাজনীতি
  14. লিড নিউজ
  15. শিক্ষা
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্ট

ড. নাসিম বানু
আগস্ট ১৫, ২০২১ ১:২৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন সার্বভৌম ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও লালিত স্বপ্ন ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন দার্শনিক, রাজনীতিবিদ। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন জগৎ বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের সাথে তুলনা করা যায়। সক্রেটিসের বিশ্ব বিখ্যাত উক্তি ‘আই টু ডাই, এন্ড ইউ টু লিভ. হুইচ ইজ বেটার অনলি গড নোজ’।

গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসকে হেমলেট লতার বিষপান করিয়ে গ্রিকরাজ হত্যা করেছিলেন। শুধুমাত্র গ্রিক সভ্যতার নয়, পৃথিবীর রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে এত বড় শূন্যতা আর কাউকে দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হয়নি। এমনকি এটা প্লেটো বা এরিস্টটলের মত দার্শনিকরাও পূরণ করতে পারেনি। ঠিক একই ভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তির মদদে ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কতিপয় বিপথগামী সেনা সদস্য সপরিবারে হত্যা করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হলো, জাতি হিসেবে আমরা আজ পর্যন্ত সেটা পূরণ করতে পারিনি, ভবিষ্যতেও পারব না। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ছিল, স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা গড়ার, অঙ্গীকার ছিল গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠন অর্থাৎ ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। পররাষ্ট্রনীতি ছিল সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ ভাব নয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শূন্যস্থান পূরণীয় নয় এটা আমরা সকলেই জানি।

বাঙালি জাতির মুক্তির মহানায়কের প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হল, শুরু হলো ইতিহাস বিকৃতি, জাতির পিতার অঙ্গীকার গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতিত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হলো, জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন স্তব্ধ হয়ে গেল। সৃষ্টি হলো আরও অনেক নতুন প্রতিকূলতা। জাতির পিতার হত্যা বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলল। পরিণতিতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যা ও তৎপরবর্তী রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতার সৃষ্টির নেপথ্যের কুশীলব জেনারেল জিয়া রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে। দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার বিলুপ্তি হয়। নির্বাচন হল জনপ্রিয়তা এবং জনরায় জানার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। নির্বাচনের মাধ্যমে ভোট প্রদান করে জনগণ দেশে গণতান্ত্রিক চর্চায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু জেনারেল জিয়া বাংলাদেশে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোটের প্রচলন করে। স্বাধীনতার পর সোনার বাংলার স্বপ্ন পূরণে বঙ্গবন্ধুর অগ্রাধিকারদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার কাঠামো দুর্বল করে ফেলে। জেনারেল জিয়া থেকে জেনারেল এরশাদ ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার নামে সামরিক শাসন চলতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি ব্যাহত হয় এবং সামরিক শাসকগোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দেশের গণতন্ত্র রাজনৈতিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করে ফেলতে থাকে। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে তারা প্রাধান্য বিস্তার করে। দেশে সাংবিধানিক পরিবর্তন আনে, বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বিলুপ্ত হয়। দেশে মৌলবাদের উত্থান ঘটে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে মৌলবাদীদের একছত্র আধিপত্য সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা: আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পাকিস্তানিদের প্রতিক্রিয়া
প্রশাসনের সর্বস্তরেই মৌলবাদের অস্তিত্ব সক্রিয় হয়ে উঠে। সর্বস্তরে দুর্নীতি বাসা বাধতে থাকে এবং ধীরে ধীরে দেশ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে রাজনীতি এবং প্রশাসন সর্বস্তরে অবিশ্বাস আর আস্থাহীনতা শুরু হয়। সাংবিধানিক পরিবর্তন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিবর্তন আনার ফলে রাজনৈতিক চেতনায় পরিবর্তন আসে। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করে জাতিকে বিভক্ত করে ফেলা হয়। জাতি ভেদ প্রথা জাগ্রত হয়ে উঠে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের উপরে আগ্রাসন চালানো হয়। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি চুক্তি করে সমস্যা সমাধানের পথে যাত্রা করেন।

সাংবিধানিক পরিবর্তনে সমাজতন্ত্রের বিলুপ্তি হয়। পুঁজিবাদী অর্থনীতি দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। ফলে ধনীরা আরও ধনী হয় আর দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হতে থাকে। বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে শ্রেণিভেদ বাড়তে থাকে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে বিশেষ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষায় আগ্রহী হয়ে উঠে। ফলে গণমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, সাধারণ ছাত্ররা মান সম্পন্ন উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।

ড. মুহাম্মদ কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের মাধ্যমে বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার যে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল সেটা ব্যাহত হয়। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ উত্তর ভঙ্গুর পৃথিবীর পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন করা সম্ভব হয়েছিল বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের জাতির জাতির পিতা অসম্ভব দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। তিনি একটি বিজ্ঞানমনষ্ক জাতি গঠন করতে চেয়েছিলেন। বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য মানব সম্পদ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ড. মুহাম্মদ কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের কার্যক্রম ব্যাহত হয়, ব্যাহত হয় একটি শিক্ষিত বিজ্ঞান সম্পন্ন জাতি গঠন প্রক্রিয়া। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুনরায় বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করে। বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, দ্বিতীয় বিপ্লবের মূল কথা ছিল রাজনৈতিক ঐক্যভিত্তিক একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রশাসনকে জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসনকে শক্তিশালী কাঠামো হিসাবে গড়ে তোলা হয়। প্রতিটি জেলায় একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে জেলা গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য। এক কেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থা জেলা গভর্নরের অবস্থান প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি ব্যতিক্রম ধর্মী উন্নয়ন কর্মসূচি। দেশের প্রতিটি জেলার যদি উন্নয়ন হয় স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র দেশের উন্নয়ন হবে। জাতির পিতার সোনার বাংলা গড়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সু-শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অমর অবিনশ্বর বঙ্গবন্ধু প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের মূল চেতনা। দ্বিতীয় বিপ্লবের চেতনাকে বাস্তবায়ন করার জন্য ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করা হয়েছিল। বাকশাল ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক কৌশল সম্মিলিত পরিকল্পনা ভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচি যার মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদায় আসীন করাই ছিল উদ্দেশ্য। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাকশালের ন্যায় একটি আদর্শিক কর্মসূচির মৃত্যু ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি বাকশালকে বিকৃত অর্থে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে, প্রচার করে একটি উন্নয়ন মডেলের সুবিধা থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করে।

আমরা জাতি হিসাবে দুর্ভাগা, আমরা আমাদের জাতির পিতার হত্যাকারীদের প্রতিরোধ করতে পারিনি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে চলে গেলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। বঙ্গমাতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সকল প্রেরণার উৎস এবং সংকটে সংগ্রামে নির্ভর সহযাত্রী। আমরা হারিয়েছি শেখ কামালের মত তরুণ নেতৃত্ব। বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে শেখ জামালের মত সেনা কর্মকর্তার অবদান থেকে, শিশু রাসেলের মত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম থেকে। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উন্নয়ন অনেক আগেই নিশ্চিত হত। আমরা এটা আস্থা এবং বিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ তথা সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন পূরণে অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তার প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক আসনে মানবিক বাংলাদেশ, স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশ, সামাজিক উন্নয়নের রোল মডেল।

লেখক: প্রো-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।