ঢাকারবিবার , ২৫ জুলাই ২০২১
  1. অর্থনীতি
  2. আইটি
  3. আন্তর্জাতিক
  4. খেলাধুলা
  5. জাতীয়
  6. দিরাই শাল্লার খবর
  7. ধর্ম
  8. প্রবাস
  9. বিনোদন
  10. মুক্ত মতামত
  11. মুক্তমত
  12. মৌলভীবাজার
  13. রাজনীতি
  14. লিড নিউজ
  15. শিক্ষা

বিজ্ঞাপনের ভাষা এবং আমাদের সততা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা

কালনী ভিউ
জুলাই ২৫, ২০২১ ১১:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ইদানিং কিছু টিভি চ্যানেলে প্রচারিত ঢেউটিন, তেল এবং স্যানেটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপন মনের মধ্যে ভীষণভাবে পীড়া দিচ্ছে।

এক সময় জনসাধারণের শিল্প সংস্কৃতির চর্চা , খবর এবং বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতার। বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বাংলাদেশ বেতার এর উপস্থাপনাসহ সকল ধরণের অনুষ্ঠান উপভোগ করার মাধ্যমে যেমন শুদ্ধ এবং প্রমিত বাংলা ভাষা শিখার সুযোগ হয় তেমনি বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে জন সাধারণকে সচেতন করার দায়িত্বও পালন করে যাচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতার রাষ্ট্রায়াত্ব দুটি প্রতিষ্ঠান। সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ডকে জনসাধরণের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্যও এ দুটি প্রচার মাধ্যম দীর্ঘ দিন থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে আসছে।

শৈশবে বিটিভিতে সম্প্রচারিত প্রতিটি অনুষ্ঠানই দেখার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম। বিশেষ করে হানিফ সংকেতের পরিকল্পনা ও উপস্থাপনায় ‘ইত্যাদি’ শিরোনামে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান যা আজও দর্শক প্রিয়তা হারায়নি। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলার আনাচে খানাচে লুকিয়ে থাকা অনেক মেধাবী শিল্পী এবং শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় নিজের প্রচেষ্টায় মেধার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন এমন লোককে খুঁজে বের করে তাদের প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগের কথা আজও দেশের সাধারণ দর্শক শ্রুতার মনে জেগে আছে। ‘নতুন কুঁড়ি’ নামে যে শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রচারিত হত সে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীগণ আজকে নিজের অধিক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে শিল্প সংস্কৃতি অঙ্গণকে আলোকিত করে যাচ্ছেন। বিটিভিতে প্রচারিত মানোত্তীর্ণ নাচ গানের প্রতিটি অনুষ্ঠান দর্শক শ্রুতার মনকে আন্দোলিত করত। শুধুমাত্র বাংলাদেশ বেতার ও বিটিভি প্রচারিত সংবাদ দর্শক শ্রুতার পিপাসা মিটাতে পারতো না । আর যত ধরনের অনুষ্ঠান প্রচারিত হত তার সবগুলো অনুষ্ঠানই অত্যন্ত উঁচু মানের ছিল।
বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রায়ত্ব দুটি প্রচার মাধ্যম অত্যন্ত সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে। শৈশবে যখন বিটিভিতে ছায়া ছবি-যা মাসে একদিন প্রচার করা হত-‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠান কিংবা ধারিবাহিক বা সপ্তাহিক নাটক প্রচার করা হত, তখন মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন বিরতি চলত । তখন বিজ্ঞাপনগুলোর দিকে এক পলকে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে থাকতাম, মনে হত অনুষ্ঠানের চেয়ে বিজ্ঞাপন দেখা তো কোন অংশেই কম মজার না। সেই বিজ্ঞাপন গুলো দেখলে এবং তার সংলাপ রচনার ধরন দেখলে নির্মাতার মেধা-মনন, চিন্তা-চেতনা, রুচিবোধ, নৈতিক দর্শন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠতো; আর সেটা যে সকল দিক থেকেই মানোত্তীর্ণ ছিল সেটা নির্দ্বিধায় বলা চলে। সমাজে কোন ধরনের খারাপ প্রভাব পরবে এরকম কোন সংলাপ বা চিত্র বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রচার করা হতো না। বলা চলে, বাংলা ভাষাকে লালন করার একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছিল রাষ্ট্রাত্ব দুটি প্রচার মাধ্যম যা আজও অব্যাহত আছে।

২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল সম্পূর্ণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় একুশে টিভির সম্প্রচার শুরু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রচার মাধ্যমের, বিশেষ করে টিভি সম্প্রচার এর জগতে নতুন যুগের সূচনা হয়। একমাত্র রাষ্টায়ত্ব ইলেক্ট্রনিক প্রচার মাধ্যম বাংলাদেশের টেলিভিশন এর সাথে পাল্লা দিয়ে একুশে টেলিভিশন বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান নির্মাণ করে দর্শক শ্রুতাকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। বিটিভির অনুষ্ঠানের চেয়েও ভাল মানের অথবা সমমানের এবং জনপ্রিয় অনুষ্ঠান গুলো প্রচার করার মাধ্যমে একুশে টেলিভিশন সাধারণ দর্শকের মনে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেয়। তবে, একুশে টিভি প্রচারিত সংবাদ সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল। বিটিভির সংবাদ দর্শক শ্রুতাদের পিপাসা নিবারণ করতে না পারলেও একুশে টিভি সংবাদ পরিবেশনায় চমক সৃষ্টি করে দর্শক শ্রুতার মনের শুন্য স্থানটি ঠিকই পূর্ণ করেছিল। তখন ও বিজ্ঞাপনে ভদ্র সংলাপ ও রুচিশীল দৃশ্য প্রচারিত হতে থাকে। সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে একুশে টিভির ভাগ্যে নেমে ঘুর অমানিষা।
ইতোমধ্যে একাধিক বেসরকারি টেলিভিশন তাদের অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করতে থাকে। আস্তে আস্তে বেসরকারি ইলেট্রনিক মিডিয়া বিটিভিকে ছাপিয়ে পুরো অধিক্ষেত্র দখল করে নেয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন ইলেক্ট্রনিক প্রচার মাধ্যম অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয় এবং কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি করতে পারলেও অনুষ্ঠানের মান যেন খুব একটা ধরে রাখতে পারেনি। দিন দিন অনুষ্ঠানের মান পড়তির দিকে যাওয়া শুরু করে। রুচিবোধ, নান্দনিকতা , সৃজনশীলতা, শিল্পবোধের চেয়ে টাকা উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত হতে থাকলো বেসরকারি টেলিভিশন গুলো।
ইদানিং বেশ কয়েকটা টিভি চ্যানেলে কিছু বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে যা রীতি মত রুচিশীলতা, ভদ্রতা এবং নৈতিকতাকে ছাড়িয়ে গেছে। একটা ঢেউটিনের বিজ্ঞাপনের সংলাপে একপর্যায়ে শোনা যায় ‘দুর্নীতি করেও তো চ্যাম্পিয়ান বা এক নম্বর হওয়া যায়’। আবার অন্য আরেকটা বিজ্ঞাপনে মডেলকে মিথ্যা কথা বলতে শোনা যায়। কনে দেখতে গিয়ে বাড়িয়ে বলতে গিয়ে একপর্যায়ে বর বলছে সে ময়মনসিংহ ক্যাডেট কলেজে (মহিলা ক্যাডেট কলেজ) পড়াশোনা করেছে। অন্যদিকে, স্যানেটারি ন্যাপকিনের একটা বিজ্ঞাপনে একপর্যায়ে মডেল হিসেবে বিদ্যালয়ের ছাত্রীর মুখে একটা অসভ্য অশ্রাব্য সংলাপ তুলে দেয়া হয়। শিক্ষক বলছেন ‘বল তো বাংলাদেশের প্রথম মহিলা পাইলট কে?’ সবাই বলতে থাকে ‘দাঁড়াও দাঁড়াও’ । ছাত্রী তখন বলে উঠে ‘দাঁড়ালে দাগ লেগে যাবে যে’। কী অসভ্য এবং অশ্লীল যুগে আমাদের প্রচার মাধ্যম গুলো ঢুকে গেল সেটা ভাবা যায় !
এ বিজ্ঞাপন গুলোর সাথে যারা জড়িত আছেন যেমন- নির্মাতা, কলাকুশলী, বিজ্ঞাপনের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান, সম্প্রচারকারী কর্তৃপক্ষ কারো মনে কি একটিবার ও আঘাত করল না যে, দুর্নীতিতে উস্কে দেয়া, মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং মেয়েদের একেবারেই গোপনীয় বিষয় নিয়ে সংলাপ তৈরী করে সম্প্রচার করলে সমাজে এর কী প্রভাব পড়তে পারে ? এ বিজ্ঞাপন গুলোর মাধ্যমে দুর্নীতির দিকে মানুষকে ধাবিত করা হচ্ছে। তরুণ সমাজের মধ্যে প্রচার করা হচ্ছে যে, মিথ্যা বলাটা একটা স্মার্টনেস এর পর্যায়ে পড়ে। আর নারীদের নিয়ে যা খুশি তাই বলা যায় , এটাই প্রচার করতে চাইছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই । এসব নেতিবাচক বিজ্ঞাপন প্রচার অব্যাহত থাকলে এর কুফল আমাদের ভোগ করতে হবে। সমাজে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিবে, মিথ্যে বলার লোক বৃদ্ধি পাবে এবং মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হতে হবে।এটা রোধ করতে না পারলে আমাদের সমাজ ক্রমান্বয়ে অবক্ষয়ের দিকেই যাত্রা শুরু করবে বলেই প্রতীয়মান হয়।
ঘরে আগুন লাগলে উঠান পর্যন্ত যে সেটা বিস্তার লাভ করতে পারে সেদিকে কি কারো নজর আছে ? আমি সংশ্লিষ্ট ইলেক্ট্রনিক সম্প্রচার মাধ্যমগুলোকে এধরনের নেতিবাচক বিজ্ঞাপন প্রচার থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করছি । আর সেটা না হলে সে বিষয়ে প্রচার মাধ্যমগুলেকে নির্দেশনা প্রদান করে এরকম বিজ্ঞাপন যাতে প্রচার না করে বা প্রচার করা বন্ধ করে, সরকার তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তা না হলে আমাদের তরুণ সমাজ এসব নেতিবাচক বিষয়গুলোর মধ্যে ক্রমান্বয়ে নিমজ্জ্বিত হতে থাকবে, আর সমাজ আস্তে আস্তে অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করার এখনই উৎকৃষ্ট সময়।

লেখক:
মোহাম্মদ জাহির মিয়া তালুকদার
ইন্সট্রাক্টর
উপজেলা রিসোর্স সেন্টার
বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।