দিরাই হাসপাতালের হযবরল অবস্থা: জনবল সরঞ্জাম সংকটে সেবা বঞ্চিত হাওরবাসী

কালনী ভিউকালনী ভিউ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:০৮ PM, ১৯ জুলাই ২০২১

মুজাহিদুল ইসলাম সর্দার::

জনবল ও সরঞ্জাম সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে দিরাই হাসপাতাল, চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হাওরবাসী। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাওর বাসীর উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে দিরাই বাসীর একমাত্র সরকারি হাসপাতালটি ৩০ শয্যা থেকে ২০১৬ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। প্রয়োজনীয় জনবল সংকট ও সরঞ্জামের অভাবে স্বাস্থ্যসেবা চরম ব্যাহত হচ্ছে।

৩০ শয্যার জন্য মঞ্জুরীকৃত চিকিৎসক রয়েছেন ৫ জন। সিনিয়র স্টাফ নার্স ১৪ টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৪ জন। বাকি ১৫ টি পদের বিপরীতে রয়েছেন ১৩ জন। কর্মরত ৫ জন ডাক্তারের মধ্যে রুটিন অনুযায়ী একজন করে ডিউটি করেন জরুরী বিভাগে তবে তারা কেউ জরুরী বিভাগে অবস্থান করেন না, রোগীদের চিকিৎসা দেন কমিউনিটি উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার ও ডিপ্লোমা ইন্টার্নি চিকিৎসকরা, তবে স্থানীয় সচেতন রোগীরা আসলে ডাক্তার কে ফোন করে ডেকে আনা হয়, হাসপাতাল কোয়ার্টারে প্রাইভেট চেম্বারে রোগী নিয়েই ব্যাস্ত থাকেন মেডিকেল অফিসাররা। এতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম। ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে এলাকার চিকিৎসা সেবা নিতে আসা অসচ্ছল ও দরিদ্র রোগীদের। উপজেলা হাসপাতালে এমনিতেই সমস্যার কোন শেষ নেই। তার উপর নতুন করে করোনার প্রভাব, প্রতিদিন উপজেলায় লাফিয়ে বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। সব মিলিয়ে হযবরল অবস্থা রয়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি।

এ পরিস্থিতিতে জনবল ও যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রীর চরম সংকট রয়েছে। এই উপজেলায় তিন লাখ মানুষের জন্য হাসপাতালে কাগজে কলমে ৫০ শয্যা হলেও মূলত ৩০টি বেড রয়েছে । ফলে এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে চরম আতঙ্ক ও শঙ্কার বিরাজ করছে। এই শঙ্কার মধ্যে প্রতিদিন বিভিন্ন গ্রামের মানুষের জ্বর, সর্দি-কাশি, গলায় ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হয়ে হাসপাতালে এলে তাদেরকে এন্টিজেন পরীক্ষায় ৫ থেকে ৬ ব্যক্তির শরীরে করোনা শনাক্ত হচ্ছে।

কোটি টাকা খরচে তিনতলা ভবন নির্মাণ করে ঢাকঢোল পিঠিয়ে ৫০ শয্যায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির উদ্বোধন করলেও মূলত ৩০ শয্যার লোকবলই নেই এখানে।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন ঘোষণা করলেও চিকিৎসক ও সরঞ্জাম সংকট ছিল সেই সময়েও। বর্তমানেও এক্স-রে মেশিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম সহ সকল সরঞ্জাম অকেজো। এ সুযোগে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে চলছে পরীক্ষা বাণিজ্য। নিন্ম মানের সরঞ্জাম দিয়ে পরীক্ষায় করায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা এ রিপোর্ট এর উপর আস্থা রাখেন না, অথচ চড়া দামে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে করাতে হয় পরীক্ষা। পরীক্ষা প্রতি ডায়াগনস্টিক সেন্টারও কমিশন দিচ্ছে কিছু চিকিৎসকদের।

মেডিকেল অফিসাররা প্রাইভেট চেম্বারে ব্যস্ত থাকার ফলে প্রতিদিন চিকিৎসা সেবা নিতে আসা এলাকার অসচ্ছল ও দরিদ্র রোগীরা কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না।

এলাকার সাধারণ রোগীদের অভিযোগ, দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপযুক্ত সেবা না পেয়ে সামান্য সমস্যাতেই রোগীদের সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপালে স্থানান্তর করা হচ্ছে। ফলে দিরাইয়ের সাধারণ রোগীরা জেলা, বিভাগীয় শহরসহ বিভিন্ন ক্লিনিক ও প্রাইভেট চিকিৎসা কেন্দ্র নির্ভর হয়ে পড়েছেন। এতে করে হতদরিদ্র রোগীদের ভোগান্তি সীমাহীন । অনেক সময় আবার রোগীরা এলাকার হাতুরে ডাক্তার খপ্পরেও পড়েন। তখন মড়ার উপড়ে খাড়ার ঘা। তাই সাধারণ রোগীদের ভোগান্তি নিরসনে শূন্য পদে চিকিৎসক পদায়নসহ যাবতীয় সমস্যা সমাধানে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন এলাকার রোগীদের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা উপজেলার রফিনগর গ্রামের পারুল বেগম (৫৫) বলেন, কয়েক দিন যাবৎ শরীর খুব দুর্বল, কিছু খেতে পাড়ছি না। কিছু খেলেই বুমি হচ্ছে, তাই হাসপাতালে এসেছিলাম ছিলাম ভর্তি হওয়ার জন্য। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও হাসপাতালের যা অবস্থা, ডাক্তার নাই, নার্স নাই, পরিচ্ছন্নকর্মীরা দিচ্ছে চিকিৎসা, এ পরিস্থিতিতে আমি ভর্তি হয়নি।

উপজেলার আসমা খাতুন (২৮) নামের একজন রোগী হাসপাতালে গাইনী ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা সেবা নিতে এলে কাউকে না পেয়ে তিনি বলেন, অনেক খোজাখুজি করেও হাসপাতালে গাইনী ডাক্তার পাইনি। তাই ফিরে যাচ্ছি। আমি গরীব মানুষ কি করবো ভেবে পাচ্ছি না, আমাকে জরুরি ভিত্তিতে গাইনী ডাক্তার দেখাতে হবে। এখন কোন উপায় না, তাই যেকোন প্রাইভেট ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা সেবা নিতে হবে।

উপজেলার রাজানগর গ্রামের তাজুল ইসলাম (৩৭) অভিযোগ করে বলেন, কয়েকদিন আগে কাজ করার সময় আমার কোমড়ে ব্যাথা পেয়েছিলাম। সেই ব্যাথা এখন আরও বেশি হচ্ছে। তাই এই হাসপাতালে আসলাম। বহির্বিভাগে কর্তব্যরত এক ডাক্তার বললেন এখানে হবে না সিলেট ওসমানী হাসপাতালে যেতে বললেন। আমি কিভাবে যাব তা ভেবে পাচ্ছি না।

স্বজন কে হাসপাতালে নিয়ে আসা উপজেলার তাড়ল গ্রামের আলীনুর চৌধুরী বলেন, ২ দিন যাবৎ হাসপাতালে অবস্থান করছি, এখানে সেবার মান খুব খারাপ , ভর্তি রোগীদের মাঝে নিন্মমানের খাবার পরিবেশন করা হয় যা খাওয়ার অনুপযোগী, বাথরুমে পানি নেই অপরিচ্ছন্ন,ব্যবহার করার মত অবস্থা নেই। কোন নিয়মনীতি না যখন ইচ্ছা ডাক্তার আসেন, রোগীর কোন সমস্যা হলে ডাক্তার খুঁজে পাওয়া যায় না।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. স্বাধীন দাস বলেন, যদিও ৫০-শয্যার হাসপাতাল কিন্তু ৩০ শয্যার লোকবলও আমার নেই, সামার্থ্য অনুযায়ী রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন :