ভরসা এখনো দানের টিকা!

কালনী ভিউকালনী ভিউ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:১১ PM, ১৮ জুলাই ২০২১

মাহমুদুল হাসান::

*উপহার এসেছে প্রায় ৯০ লাখের বেশি ডোজ
*আরও প্রায় এক কোটি ডোজ উপহার পাবে
*লক্ষ্য প্রায় ৯ কোটি মানুষকে টিকাদানের
*দুটি দেশের সঙ্গে ৪.৫ কোটি ডোজের চুক্তি
*জাপান থেকে আসবে ২৯ লাখ ডোজ
*যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে ২৬ লাখ; আরো দেবে ৭০ লাখ
*টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন এক কোটি পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৯৫৭ জন তার মধ্যে টিকা নিয়েছেন ৬৬ লাখ ৩১ হাজার ১৩৪ জন
*টিকাদানে দক্ষিণ এশিয়ায় পিছিয়ে বাংলাদেশ

উপহার-অনুদানে চলছে দেশের গণটিকাদান। ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকাদানের লক্ষ্য থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি দেশের সঙ্গে সাড়ে চার কোটি ডোজের ক্রয়চুক্তি হয়েছে। লক্ষ্যপূরণে প্রয়োজন প্রায় ১৮ কোটিরও বেশি ডোজ টিকা। চাহিদা অনুপাতে সংগ্রহের অপ্রতুল চেষ্টায় রয়েছে বাধা। চুক্তি অনুসারে তিন কোটি ডোজ টিকা দেয়ার কথা থাকলেও দুই মাসে ৭০ লাখ ডোজ টিকা দেয়ার পর টিকা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত। অন্যদিকে, সম্প্রতি চীনের সঙ্গে দেড় কোটি ডোজ টিকা ক্রয়ের চুক্তি হয়েছে। সেখান থেকে গতকাল শনিবার দুটি ফ্লাইটে এসেছে ২০ লাখ ডোজ। অন্যদিকে, টিকার জন্য আবেদন করেছে এক কোটির বেশি মানুষ। ইতোমধ্যে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে প্রায় ৯০ লাখ ডোজেরও বেশি টিকা উপহার পাঠিয়েছে। সম্প্রতি জাপান সরকার কোভ্যাক্সের আওতায় আরও ২৯ লাখ ডোজ টিকা পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ৭০ লাখ ডোজ টিকা উপহার পাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে ক্রয়কৃত টিকা এসেছে মাত্র ৯০ লাখ। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, করোনা মোকাবিলায় দেশের টিকাদান কর্মসূচি অনেকটা উপহার আর দানের ওপর নির্ভর করেই চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত সাত ফেব্রুয়ারি ৫৪তম দেশ হিসেবে গণটিকাদান শুরু হয়। গত ২৫ এপ্রিল ভারত সরকার টিকা রপ্তানি বন্ধ করলে বিপাকে পড়তে হয় সরকারকে। টিকার সরবরাহ ঠিক না থাকায় দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো টিকাদান। টিকার রেজিস্ট্রেশনের বয়সও কমিয়ে আনা হয়েছে। শিগগিরই ১৮ বছরের মধ্যে বয়সসীমা নামিয়ে আনার আভাসও দিয়েরেছন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ পর্যন্ত এক কোটিরও বেশি মানুষ টিকা গ্রহণের আগ্রহ দেখালেও টিকাদানের তেমন অগ্রগতি নেই। তার মধ্যে সোয়া ৬৬ লাখের কিছু বেশি মানুষ প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের এক কোটির বেশি ডোজ টিকা নিয়েছেন। দেশে এখন অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড, ফাইজার, মডার্না ও চীনের সিনোফার্মের টিকাদান চলছে। ভারত টিকার সরবরাহ বন্ধ করায় কোভিশিল্ডের প্রথম ডোজ নিয়ে বিপাকে আছে অন্তত ১৫ লাখ মানুষ। কবে নাগাদ তারা দ্বিতীয় ডোজ টিকা পাবেন এ বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারছে না। করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ধরন নিয়ে বাংলাদেশ হুমকির মুখে থাকলেও, টিকার জন্য উপহার আর ভিক্ষার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে বলে সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি বলেন, উপহার আর দানের সংগৃহীত অপর্যাপ্ত টিকা দিয়ে করোনার মতো মহামারি মোকাবিলা সম্ভব নয়।’

তথ্য ও যোগায়োগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএসের তথ্যমতে, গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে এক কোটি পাঁচ লাখ ৫১ হাজার ৯৫৭ জন টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন। সেখান থেকে ৬৬ লাখ ৩১ হাজার ১৩৪ জনকে চারটি কোম্পানির প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলিয়ে এক কোটি ৯ লাখ ৩০ হাজার ১৩১ ডোজ টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে। তার মধ্যে অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকা নিয়েছেন এক কোটি এক লাখ ১৬ হাজার ৭৭১ জন। তার মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছে ৫৮ লাখ ২০ হাজার ৩৩ ডোজ এবং তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৪২ লাখ ৯৬ হাজার ৭৩৮ ডোজ। প্রথম ডোজ নিয়ে এখনো দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় রয়েছে ১৫ লাখ ২৩ হাজার ২৯৫ জন ব্যক্তি। সিনোফার্মের টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে ছয় লাখ ৫৩ হাজার ৮০৮ ডোজ। তার মধ্যে প্রথম ডোজ নিয়েছেন ছয় লাখ ৫১ হাজার ৫৪৯ ডোজ। আর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে আরও দুই হাজার ২৫৯ ডোজ। এ ছাড়াও মডার্নার এক লাখ ১২ হাজার ৫৭১ ডোজ ও ৪৬ হাজার ৯৮১ ডোজ ফাইজারের টিকা গ্রহণ করা হয়েছে।

অধিকাংশই দানের টিকা : তথ্যমতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোভ্যাক্সের আওতায় বাংলাদেশকে ২৫ লাখ ডোজ মডার্নার টিকা উপহার দিয়েছেন। ফাইজারের এক লাখ ছয় হাজার ডোজ টিকাও কোভ্যাক্সের আওতায় দেশটি থেকে এসেছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছয় থেকে আট কোটি ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা মজুত রয়েছে জানতে পেরে ঢাকা ওয়াশিংটন ডিসিকে অবিলম্বে ২০ লাখ ডোজ অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন পাঠানোর জন্য অনুরোধ করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও ১০ লাখ এবং কোভ্যাক্সের অধীনে আরও প্রায় ৬০ লাখ বিশ হাজার ডোজ টিকা শিগগিরই আসার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এদিকে সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, চলতি মাসেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোভ্যাক্সের আওতায় আরও ৫৯ লাখ কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের মধ্যে ৩০ লাখ ডোজ হবে মডার্নার টিকা, আর ২৯ লাখ ডোজ টিকা ফাইজারের।

চীনের সঙ্গে দেড় কোটি ডোজ টিকা ক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল রাতে দুটি ফ্লাইটে প্রথম ২০ লাখ ডোজ টিকা দেশে এসেছে। ইতোমধ্যে দেশটি তিন দফায় ৩১ লাখ ডোজ সিনোফার্মের টিকা উপহার পাঠিয়েছে। এদিকে গত বছর ২০২০ সালের শেষের দিকে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সেরামের এদেশীয় পরিবেশক বেক্সিমকো ফার্মার সঙ্গে তিন কোটি ডোজ অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোভিশিল্ড টিকা আমদানির চুক্তি হলেও মাত্র ৭০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করে ভারত। এরপরই ভারত সরকার টিকা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এতে গত ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া গণটিকাদান বন্ধ করতে হয়। পর্যাপ্ত টিকা না থাকায় ২৫ এপ্রিল দেশে প্রথম ডোজ দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। যারা প্রথম ডোজে কোভিশিল্ড নিয়েছেন, তাদের সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে সরকার চীন ও রাশিয়া থেকে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশকে ভারত এ পর্যন্ত তিন দফায় টিকা উপহার দিয়েছে ৩৩ লাখ। ভারত প্রথম দফায় চলতি বছর ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ২০ লাখ টিকা উপহার দেয়। দ্বিতীয় দফায় ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় এলে ১২ লাখ টিকা উপহার দেন। তৃতীয় দফায় ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরভানে গত ৮ এপ্রিল ঢাকায় এলে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের কাছে এক লাখ উপহারের টিকা হস্তান্তর করেন। কোভ্যাক্সের আওতায় সরকার ভাইজারের আরও এক লাখ ছয় হাজার ডোজ টিকা পেয়েছে। এ ছাড়া বন্ধুপ্রতীম জাপান কোভ্যাক্সের আওতায় ২৯ লাখ ডোজ অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উপহার পাঠাবে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেন, ‘উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যেই রোডম্যাপ অনুযায়ী গণটিকা কর্মসূচি শুরু করেছে। এসব দেশের মানুষ জানে কখন তাদের টিকাদান কর্মসূচি শেষ হবে। কিন্তু, আমাদের দেশের কেউই জানে না কখন আমরা গণটিকা শুরু করতে পারবো। প্রতিদিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আশ্বাসের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু কোনো সাফল্য নেই। টিকা কূটনীতিতে বাংলাদেশ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে উপহারের পাঁচ থেকে ১০ লাখ টিকা পেয়ে স্বস্তির ঢেঁকুর তুলছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অথচ ১৮ কোটি মানুষের টিকা পাওয়ার বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

আপনার মতামত লিখুন :