কাকে দোষ দেব? সবক্ষেত্রেই স্বাস্থ্য উপেক্ষিত

কালনী ভিউকালনী ভিউ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৭:৫২ PM, ১১ জুলাই ২০২১

সৈয়দ আব্দুল হামিদ::
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার চিত্র কাউকে নতুনভাবে বুঝিয়ে বলার বোধ হয় প্রয়োজন নেই। এই দুরবস্থার জন্য আমরা অনেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দায়ী করছি। জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়া হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ তাঁদের এলাকার স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরছেন। এটা অন্তত ভালো যে সংসদ সদস্যরা অনেক দেরিতে হলেও স্বাস্থ্য খাতের ভঙ্গুর দশার চিত্র বুঝতে পারছেন।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও সংবাদমাধ্যম এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টার চিত্র বিস্তারিতভাবে জাতির সামনে তুলে ধরছে। কিন্তু এই দুরবস্থার জন্য কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একাই দায়ী? ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সর্বত্রই তো স্বাস্থ্য উপেক্ষিত। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে ব্যস্ততা, ক্যারিয়ার গঠন, আরাম-আয়েশ ও সাধ-ইচ্ছা পূরণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উপস্থিতিসহ সর্বক্ষেত্রে কি আমরা স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করি না? আর সামাজিক ক্ষেত্রেও কি স্বাস্থ্যের গুরুত্ব আছে? স্বাস্থ্য গঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সামাজিক জায়গা যেমন খেলার মাঠ এবং পার্কের পরিবর্তে বাজার কিংবা অন্য অর্থকরী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বেশি ব্যস্ত থাকি না?

রাষ্ট্রীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ৮ নম্বরে। তবে সেটি আরও এগিয়ে আনলেও সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তা ভাবার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার পরপরই প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে থানা হেলথ কমপ্লেক্স (এখন যা উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স)-সহ পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। পরে কমিউনিটি ক্লিনিকের সংযুক্তি এ ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হাল আমলে জেলা পর্যায়ে মেডিকেল কলেজের বিস্তৃতি, বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার কাজ অব্যাহত রয়েছে। তাহলে স্বাস্থ্য খাতের এই দুরবস্থা কেন? এর প্রধান কারণ হলো সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। যেমন, মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস তৈরি হওয়ার আগে যেনতেনভাবে পাঠদান শুরু করা। একটুও ভাবা হয় না ছাত্রছাত্রীরা কোথায় থাকবে, কোথায় পড়বে এবং কোথায় ইন্টার্নশিপ করবে। সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত স্থায়ী ক্যাম্পাস তৈরির আগে কেন এই পাঠদানের অনুমতি?

বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে হাসপাতাল ৫০ থেকে ১০০, ১০০ থেকে ২০০ কিংবা ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির মাধ্যমে জনবল বৃদ্ধির দিকে কারও নজর নেই। ফলে স্বল্প জনবল দিয়ে এসব হাসপাতাল পরিচালনা করতে হচ্ছে। দেখা গেল, ১০০ শয্যার জনবল দিয়ে ২০০ বা ২৫০ শয্যার হাসপাতালও পরিচালনা করতে হচ্ছে। আবার জনবলের পদ সৃষ্টিতে ও নিয়োগের ক্ষেত্রে ডাক্তার ও নার্সের গুরুত্ব বেশি পায়। হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, আয়া, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনারসহ অন্যান্য জনবলের ভূমিকা কখনো গুরুত্ব দিয়ে অনুভব করা হয় না। তাই এসব ক্ষেত্রে শূন্য পদে জনবল নিয়োগেও দীর্ঘসূত্রতার চিত্র নতুন কিছু নয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মীমাংসার জন্য আইন-আদালত পর্যন্ত গড়ালে তা নিষ্পত্তিতে অনেক সময় এক যুগ লেগে যায়।

অন্যদিকে হাসপাতালে ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও অর্থ খরচসংক্রান্ত নানা জটিলতা, সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব এবং অডিট নিষ্পত্তির ভয়ে অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো তা খরচ করা যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অডিট অফিসকে নির্ধারিত হারে উৎকোচ না দিলে অডিট ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায় না, এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কোনো মহলের অজানা থাকার কথা নয়।

বিজ্ঞাপন
আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে বরাবরই একজন আইনজ্ঞকে মন্ত্রী বানাই। হয়তো সচিব পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা কর্মকর্তাকে খোঁজা হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাত ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে তেমন খোঁজা হয় না। স্বাস্থ্য খাতের প্রতি প্রকৃত মনোযোগের অভাবই এর প্রধান কারণ।
আর এসবের বেশির ভাগই স্বাস্থ্য খাতের সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবেরই ফসল। স্বাস্থ্য খাত আমাদের অধিকতর গুরুত্বের মধ্যে নেই বলেই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা কম পরিলক্ষিত হয়। তার একটি প্রমাণ স্বাস্থ্য খাতের কান্ডারি অর্থাৎ মন্ত্রী এবং সচিবসহ উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বেশির ভাগই স্বাস্থ্য খাত ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নন। আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে বরাবরই একজন আইনজ্ঞকে মন্ত্রী বানাই। হয়তো সচিব পদে পদায়নের ক্ষেত্রেও আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা কর্মকর্তাকে খোঁজা হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে পদায়নের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাত ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে তেমন খোঁজা হয় না। স্বাস্থ্য খাতের প্রতি প্রকৃত মনোযোগের অভাবই এর প্রধান কারণ।

সমাজের নীতিনির্ধারণী মহল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, ব্যবসায়ী এবং আমলাদের একটি বড় অংশ নিজেদের স্বাস্থ্য নিয়ে হয়তো খুব সচেতন। তাই এ দেশের ভাঙাচোরা স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তাঁদের অমূল্য জীবন অকালে বিসর্জন দিতে চান না। তাঁদের আস্থা বিদেশি স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। তাই এ দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে তাঁদের মনোযোগী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু করোনা মহামারির কারণে এখন বিদেশ যাওয়ার সুযোগ কম। তাই আমাদের নীতিনির্ধারণী মহল হয়তো স্বাস্থ্য খাতের সমন্বিত পরিকল্পনামাফিক উন্নতির কথা ভাবছে। কিন্তু এ জন্য দরকার একটি মাস্টারপ্ল্যান বা রূপরেখা প্রণয়ন।

জাতীয় সংসদ, টেলিভিশন টকশো, পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি কিংবা লেখালেখির মাধ্যমে তো আর সমন্বিত পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার স্বাস্থ্য খাত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন। এই টাস্কফোর্স আগামী তিন মাসে স্বাস্থ্য খাতের সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণ এবং সমস্যার মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করে তা নিরসনে ১৫-২০ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে, যা জাতীয় সংসদে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জাতি ২০৪০ সালে উন্নত দেশের পাশাপাশি একটি উন্নত স্বাস্থ্য খাতও পাবে, যখন আমরা স্বাস্থ্যসেবা নিতে দেশের বাইরে ছুটব না, বরং অন্য দেশের মানুষ আমাদের দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসবে। আর এ স্বপ্ন দেখা কোনোভাবেই অমূলক নয়। তবে তার জন্য দরকার রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও উদারতা, যা বর্তমান সরকারের যথাযথভাবে রয়েছে।

সব রাজনৈতিক মহলকে এই উদ্যোগের সঙ্গে শামিল করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনায় আসবে, তারাও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একইভাবে যত্নশীল হয়। তাই আসুন, সম্মিলিত উদ্যোগ ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে অগ্রসর হই।

ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :