জামালগঞ্জে মাছ চাষে আগ্রহী হচ্ছে ধান চাষীরা

কালনী ভিউকালনী ভিউ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১০:৫৩ PM, ১৮ জুন ২০২১

মো. ওয়ালী উল্লাহ সরকার, জামালগঞ্জ প্রতিনিধি::
ভাটির জনপদ হাওরাঞ্চলের একফসলী ধানের উপজেলা জামালগঞ্জ। তবে এই ধানের পরিবর্তে আরেকটি খাতের প্রসার ঘটছে তা হলো মৎস্য খাত। হাওরকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে ব্যাপক ধান জমির আওতায় এলেও অপেক্ষাকৃত কিছুটা প্রত্যন্ত এলাকায় বিস্তীর্ণ জলরাশি মাছের আবাদ অনেকাংশের কমে গিয়েছিল। বছরের পর বছর পাহাড়ী ঢলে পলি এসে হাওরের বিলের গভীরতা অনেকটাই কমে গেছে।

সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলায় ফেনারবাঁক ইউনিয়নের কৃষি পরিপূর্ণ একটি গ্রাম রামপুর। এর আশপাশে ছড়িয়ে থাকা পুকুর দেখলে বোজায় উপায় নেই এটি কোন ধানী জমির এলাকা। ব্যক্তিপর্যায়ে এ গ্রামের বিভিন্ন স্থানে চলছে মাছের আবাদ। এটি শুরু হয়েছে এক যুগ আগে। রামপুর গ্রামের মৎস্য চাষী ৫০ বছর বয়সী ফজলুল হক। তিনি এক যুগ ধরে মাছ চাষ করে যাচ্ছেন। এই গ্রামে তার মতো আরও কয়েকজন মৎস্যজীবী আছেন। তারা কেউ কেউ নিজের ধানী জমিতে পুকুর খনন করে মৎস্য চাষ করছেন। এসব মৎস্য চাষ প্রকল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে অনেক বেকার লোকজনের। উপজেলার মোট মৎস্য উৎপাদনের বেশির ভাগ মৎস্য এই গ্রামে উৎপাদিত হয়। সম্প্রতি জামালগঞ্জ থেকে সেলিমগঞ্জ বাজার পার হয়ে গজারিয়া বাজার যেতে রামপুর গ্রামের দিকে দেখা যায় ১৮টি ছোট বড় পুকুর। এগুলোর কয়েকটি পুকুর পারে দেখা যায় শতাধিক নারিকেল গাছ, আম, জাম, কাঁঠাল, কুলবরই, মালটা, ড্রাগন, লিচু, লেবু, পেঁপে ছাড়া অনেক ধরনের ফলজ ও ঔষধী গাছ।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল পুকুরে নৌকা দিয়ে মাছ ধরার জাল টানছেন কয়েকজন। পারে অপেক্ষা করছেন পুকুর মালিক ফজলুল হক ও মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ। রামপুর গ্রামের মৎস্যজীবী ফজলুল হক জানান তার মাছ চাষে যুক্ত হওয়ার কথা। আগে একফসলী বোরো ধানের উপর নির্ভর করতে হতো তাদের। কোন বছর ধান পেত আবার কোন বছর খরা বন্যার কারণে ফসল তুলতে কষ্ট হতো। আবার কোন বছর ফসল উঠলেও খরচের সাথে আয়ের তারতম্য খুবই কম। ধান চাষ করে শান্তি না পাওয়ায় কিছু জমিতে পুকুর করার চিন্তা করেন তিনি। উপজেলা মৎস্য অফিসের পরামর্শে প্রথমে ২টি পুকুর খনন করে লাভবান হওয়ায় পরের বছর আরও ৩টি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করেন। বর্তমানে তার ৪ একর জায়গায় ৫টি পুকুরে পাবদা, রুই, কাতল, পাঙ্গাস, সরপুঁটি, মৃগেল, কালিবাউস প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে।

ফজলুল হকের মাছ চাষে সফলতা দেখে তারই চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক তালুকদার আরও ২টি পুকুর খনন করেন। পরের বছর ফজলুল হকের আরেক চাচাতো ভাই মো. রজব আলী আরও ২টি পুকুর খনন করেন। একই বছরে তার আরেক চাচা আব্দুল মন্নান তালুকদার আরও ২টি পুকুর খনন করেন। গত বছর তার আপন ছোট ভাই সাইদুর রহমান ১০ বিঘা জমিতে ৭টি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করে আসছেন। এছাড়া আরও কয়েকজন পুকুর খননের জন্য ফজলুল হকের নিকট পরামর্শ নিচ্ছেন।

জামালগঞ্জ উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরে হিসাব অনুযায়ী, সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে এ উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা ৩৫০টি। বিল ৯৫টি, খাল ৪টি এবং মাছ চাষীর সংখ্যা ৩০০ জন। মৎস্যজীবী আছেন ৮ হাজার ৭৫২ জন এবং সমিতি আছে ৫৬টি। বর্তমানে উপজেলার ৪ হাজার ৭৬৯ দশমিক ২৭ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জামালগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনন্দা রানী মোদক বলেন, জামালগঞ্জে ধান চাষের পাশাপাশি মাছ চাষে অনেক কৃষক আগ্রহী হয়ে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করে আসছেন। আরও সুসংবাদ হলো এখানে চাহিদার তুলনায় মৎস্য উৎপাদন অনেক বেশি। ধান চাষের পাশাপাশি মাছ উৎপাদন অনেক উপজেলার জন্য উদাহরণ হতে পারে। অনেক কৃষক ধান চাষের পাশাপাশি পুকুর খনন করে মাছ চাষ করে লাভবান হচ্ছে। সঠিক পরিচর্যা ও পরামর্শ অনুযায়ী মাছ চাষে খরচের চেয়ে দ্বিগুণ লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। করোনাকালীন সময়ে অনেক কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে উপজেলার ছাত্র-যুবকেরা মৎস্য চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। ইতিমধ্যে কিছু ছাত্র পুরাতন পুকুর সংস্কার করে মাছ চাষ করে লাভবান হয়েছেন। আমরা তাদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কারিগরী সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।

আপনার মতামত লিখুন :