উপ-নির্বাচন: দলীয় মনোনয়নে এগিয়ে মিসবাহ-ফারজানা

কালনী ভিউকালনী ভিউ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:১৮ AM, ২৩ মে ২০২১

নীরব চাকলাদার :
দিন যতোই ঘনিয়ে আসছে, ততোই দীর্ঘ হচ্ছে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকা। তালিকায় আওয়ামী লীগের নেতা রয়েছেন প্রায় ডজনখানে। পিছিয়ে নেই প্রবাসীরাও। মোট কথা সিলেট-৩ আসনের উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সিলেট-৩ আসনে প্রার্থী জটে রয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে, স্থানীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী একটি দলীয় ভিত রয়েছে এডভোকেট মিসবাহ সিরাজের। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতিতে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ আওয়ামী লীগের কাছে একটি অবিচ্ছেদ্য নাম। দলীয় বেশ কয়েকজন প্রবাসী নেতাও রয়েছেন সিলেট-৩ আসনে ভোটারদের পছন্দের তালিকায়। এদিকে,মরহুম সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের স্ত্রী ফারজানা সামাদও স্বামীর জনপ্রিয়তাকে পূঁিজ করে প্রার্থী হতে ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন উপ-নির্বাচনে। মোট কথা-দলীয় প্রদানের দৃষ্টি আকর্ষণে এই দুজনের একজনকেই বেছে নিতে পারে আওয়ামী লীগ। এমন অভিমত-বিশ্লেষকদের।

সিলেট-৩ আনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েসের মৃত্যুতে আসনটি শুন্য ঘোষণা করা হয়। এই আসনটিতে উপ-নির্বাচনে অংশ নিতে দৌড়-ঝাপ শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের। শিল্পাঞ্চল হিসেবে সিলেট ৩ আসন সমাদৃত। গুরুত্বপূর্ণ এই আসন বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ ও দক্ষিণ সুরমা নিয়ে গঠিত। এই আসনে টানা ৩য় বারের মতো সংসদ সদস্য হিসেবে ছিলেন মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১১ মার্চ। তার মৃত্যুর পর সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে এ আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। এখন জুলাইয়ের মধ্যে দেশে শুন্য আসনগুলোতে নির্বাচন করতে চায় ইসি। ১৯ মে বুধবার বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে কমিশন সভায় এই সিদ্বান্ত গৃহিত হয়। এরই অংশ হিসেবে শুন্য আসনগুলোতে তফসিল ঘোষণা করা হবে ২৪ মে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

যারা ইতোমধ্যে প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন উপ-নির্বাচনে তাঁরা হলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, বালাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোশতাকুর রহমান মফুর, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব, মরহুম সাংসদ কয়েস চৌধুরীর স্ত্রী ফারজানা সামাদ, বিএমএ’র কেন্দ্রীয় মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল, স্পেশাল পিপি এডভোকেট নিজাম উদ্দিন, সুপ্রিম কোর্টের সহকারী এটর্নি জেনারেল আব্দুর রকিব মন্টু, দক্ষিণ সুরমা উপজেলার চেয়ারম্যান আবু জাহিদ, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যাংকার শমশের জামাল, সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ- সভাপতি ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী তাহমিন আহমদ, যুক্তরাজ্য প্রবাসী স্যার এনামুল ইসলাম ও সাংবাদিক শাহ মুজিবুর রহমান জকন।

এদিকে, যেকয়জন প্রার্থী সিলেট-৩ আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের মধ্যে বেশি আলোচিত হচ্ছে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের নাম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতোমধ্যে দলীয় অনুসারীরা শুভকামনা জানাচ্ছেন। অনুসারীদের বক্তব্য-একজন মাঠের কর্মী হিসেবে উঠে আসা মুজিবাদর্শের এক পরিক্ষীত এবং বিশ^স্থ সিপাহশালার এর নাম মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। পারিবারিক উত্তরাধীকার সুত্রে তিনি আওয়ামী রাজনীতিতে যুক্ত হন। মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের প্রার্থীতা বিষয়ে ফেঞ্চুগঞ্জের ভোটার মোজাম্মেল আলী বলেন, দলীয় পাল্লা মিসবাহ সিরাজের দিকেই ভারী থাকবে। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, দলীয় নেত্রী বড় কিছু পুর¯কারের জন্যই কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের পদে রাখেননি মিসবাহ সিরাজকে। তাছাড়া, এবার যোগ্য পুরস্কার হিসেবে সিলেট-৩ আসনটি আদর্শিক নেতা মিসবাহ সিরাজের হাতেই তুলে দেওয়া হবে বলে মতামত প্রকাশ করেন তিনি। তবে একই সাথে ফারজানা সামাদের নামও উঠে আসছে আলোচনায়। ভোটারদের দাবি-মরহুম সংসদ সদস্য উন্নয়নের রাজনীতিতে ছিলেন বিশ্বস্থ সিপাহশালার। সুতরাং এই জনপ্রিয়তা এবং উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখতে ফারজানা সামাদকেও ভোটাররা গ্রহণ করবেন সাদরে। এ ব্যাপারে শেষমেষ দলীয় আশীর্বাদ যার উপর বর্ষিত হবে, তিনিই জয়লাভ করতে সমর্থ হবেন বলে মন্তব্য ভোটারদের।

মিসবাহ উদ্দিন সিরাজের পিতা আবদুল গফুর আওয়ামী লীগ করতেন। ফলে পরিবারটি আওয়ামী লীগ ঘরানার। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করে খুনিচক্র। ওই সময় ছাত্রাবস্থায় মিসবাহ সিরাজের দেহটি হয়ে উঠে সংগ্রামী মনোভাবের। তারপর জিয়ারউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন তিনি। শুরু হয় মামলা আর কারাজীবনের। শতশত মামলার আসামি হয়েছেন। যৌবনের প্রায় সাতটি বছর কাটাতে হয়েছে কারাগারে।

সিলেটের ঐতিহ্যবাহি মদন মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে প্রথমবারের মতো ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন তিনি। ছিলেন সিলেট জেলা ছাত্রলীগের প্রথমে সাধারণ সম্পাদক পরে সভাপতি। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সদস্য হিসেবে তিনবার স্থান করে নিয়েছিলেন। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন দুই বার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনিত হন। তিনবার ওই দায়িত্ব পালন করেছেন ২০১৯ সাল পর্যন্ত। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে দুই বার মেম্বার নির্বাচিত হন। শিক্ষা জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এলএলবি পাস করেন ১৯৮৮।

সিলেট জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন ১৯৯০ সালে। হাই কোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভূক্ত হন ১৯৯৪ সালে। এর আগে ১৯৯২ সালে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সহ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার স্পেশাল পিপি নিযুক্ত হন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার পাবলিক প্রসিকিউটর নিযুক্ত হন। দায়িত্ব পালন করেছেন চলতি মাস পর্যন্ত। মহাত্মা গান্ধী ট্রাস্টি বোর্ডের সম্মানিত সদস্য এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ। জিয়ার রহমানের শাসন আমল, এরশাদের শাসন আমল ও বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমলে সিলেটের রাজপথে প্রতিটি মূহুর্তে জ্বলে উঠতে দেখা গেছে এডভোকেট মিসবাহকে।

জিয়ার শাসন আমলে প্রথম কারাবরণ। এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর প্রতিটি মিছিল মিটিংয়ে উপস্থিতি। স্থানীয়ভাবে আন্দোলন সংগ্রামের পরিকল্পনা। যিার ফলে স্বৈরাচার এরশাদের জমানায় কারাগারে বসে এলএলবি পরীক্ষা দিতে হয়েছে এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজকে। ১৯৮৪ সালে বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্রের হোতা মোস্তাক সিলেটে সমাবেশ আয়োজন। স্থান নির্ধারণ করা হয় সিলেট আলীয় মাদরাসা মাঠ। ছাত্রলীগ পরিকল্পনা নেয় মোস্তাককে কোনোভাবে সিলেটের মাটিতে সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। সমাবেশের দিন মোস্তাক আলীয়া মাদরাসা মাঠের মঞ্চের উঠতেই হামলার শিকার হয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মোস্তাককে বেদম মারপিট শুরু করে। পরে পুলিশ বিডিআর উদ্ধার করে মোস্তাককে। জ্বালিয়ে দেয়া হয় মঞ্চ। সেখানে এঢভোকেট মিসবাহর নেতৃত্বে সমাবেশ করে ছাত্রলীগ। এর কয়েক ঘন্টার মাথায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অন্ধকার কক্ষে নিয়ে বেদম মারপিট করে জিয়ার পুলিশ বাহিনী। ওই গ্রেফতারের পর ১৭ মাস বন্দী জীবন কাটিয়েছেন কারাগারে।

এই সময়ে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে প্রায় ৫০টি। এরশাদ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় আসেন বেগম খালেদা। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার এডভোকেট মিসবাহ রাজনৈতিক সহকর্মীদের নিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি রাজপথে আন্দোলন করে গেছেন। গ্রেফতার হয়ে গেছেন কারাগারে। বেগম খালেদা জিয়ার ওই শাসন আমলে উপহার হিসেবে আসামি হয়েছেন ৪২ টি মামলার। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি সকল মামলা থেকে বেকসুর খালাস পান।

২০০১ সালে আবার ক্ষমতার পালাবদল হয়। চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসে। সর্বশেষ কারাগারে যেতে হয়েছে জরুরি অবস্থার সময়। ৪০ জন নেতা শহরতলির বটেশ্বর এলাকার একটি বাসায় নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে সবাইকে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষিপ্ত করে। ২০০৪ সালে সিলেট নগরীর তালতলায় গুলশানে গ্রেনেড হামলা হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর। আহত হয়েছিলেন এডভোকেট মিসবাহও। এই হামলায় প্রাণ হারান আওয়ামী লীগ নেতা মো. ইব্রাহিম।

২০০৬ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করার পরপরই সিলেটে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। ঘটনার দিন সন্ধ্যার কিছুটা পরপরই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় অবস্থান নেন। তাদেরকে ঘিরে ফেলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিএনপি ও জামায়াত শিবির। টানটান উত্তেজনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বারবার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সরে যেতে বলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে বলে দেয়া হয়, গণতন্ত্র পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফেরবেন না। সাবেক সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ ও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা ইফতেখার হোসেন শামীম নেতাকর্মীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেলিনে। নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করে রাখার জন্যে সব কৌশল প্রয়োগ করছিলেন। এক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ও অন্য দুইটি দলের নেতাকর্মীরা পিছু হটে। যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ।

সিলেট-৩ আসনে প্রার্থী প্রসঙ্গে মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন,আমি দীর্ঘ ৪৫ বছর রাজনীতি করছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করে চলেছি। এখন কাজ করছি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার স্লোগান নিয়ে। তিনি বলেন, আমি শতভাগ আশাবাদি-দলীয় ভাবমূর্তি এবং উন্নয়নের রাজনীতি অব্যাহত রাখার স্বার্থে জননেত্রী আমাকেই বেছে নিবেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা আমাকে যা দিয়েছেন তা অনেক অনেক। আমি কোনোদিন কোনো কিছু পাওয়ার আশায় রাজনীতি করিনি। জরুরি অবস্থার সময় অনেক লোভলালসা দেখানো হয়েছে। সব ফিরিয়ে দিয়েছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকতে চাই আওয়ামী লীগের কর্মী হয়ে। শেখ হাসিনার একজন কর্মী হয়ে।

আপনার মতামত লিখুন :