মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা: একদিকে করোনা ভীতি অন্যদিকে সরকারি বিধি

কালনী ভিউকালনী ভিউ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১২:৩২ AM, ১৩ মে ২০২১

কালনী ভিউ ডেস্ক:
একদিকে করোনা ভীতি, অন্যদিকে সরকারি বিধি। ঘাটে ঘাটে ভাড়া চার গুন, তবু চোখে মুখে আনন্দ দ্বিগুন। পথে পথে সীমাহীন দুর্ভোগ, মানুষের ক্ষোভ অভিযোগ। ছন্দে ছন্দে এভাবে বললে মন্দ লাগে না। কিন্তু বাস্তবতার একেবারে ভিন্ন।

করোনা সংক্রমণের ভয় আর সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে হুড়োহুড়ি করে ফেরিতে উঠার সময় প্রাণ গেল ৬ জনের। তবুও বাবা-মায়ের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির জন্য নানান বেড়াজাল ডিঙিয়ে ঘরে ফিরছে মানুষ। প্রতি ঘাটে ঘাটেই সীমাহীন দুর্ভোগের পরও গুনতে হচ্ছে বাড়তি তিন থেকে চার গুন ভাড়া। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

চলছে মহামারিকাল। তাই বলে কী আনন্দ নিষেধ? একদিনে গণপরিবহণ বন্ধ। অন্যদিকে বন্ধ রেল ও লঞ্চ। এছাড়াও আছে সরকারি বিধিনিষেধের কড়াকড়ি। প্রথমে সরকারিভাবে ফেরি বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরে তা ছাড়তে বাধ্য হয় কতৃপক্ষ। স্বাস্থ্যবিধিসহ নানান উপদেশ নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে মানুষ ছুটেছে বাড়ি। সীমাহীন দুর্ভোগ মেনেই নাড়ির টানে মানুষের এই স্রোত রুখবে কে?

টাইমমেশিনে সময় গুনতে শুরু করেছেন অনেকে। বিশ ঘন্টা পরেই আকাশে দেখা যাবে ঈদের চাঁদ। বুধবার রাজধানীর গাবতলী, আমিনবাজার ও হেমায়েতপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক হাজার মানুষ বাড়ি যাওয়ার জন্য যানবাহন খুঁজছেন। অধিকাংশ মানুষকেই স্বাস্থ্যবিধি মানতে দেখা যায়নি।

প্রচণ্ড ভিড়ে ফেরিতে করে মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে মাদারীপুরের বাংলাবাজারে যাওয়ার পথে হুড়োহুড়িতে ছয়জন মারা গেছেন। এ ঘটনায় অসুস্থ হয়েছেন অন্তত অর্ধশতাধিক।

বুধবার শিমুলিয়া থেকে বাংলাবাজার যাওয়ার পথে শাহ পরান ও এনায়েতপুরী নামের দুইটি ফেরিতে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে শাহ পরানে একজন ও এনায়েতপুরীতে পাঁচজন মারা যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেন শিবচর থানার ওসি মিরাজ হোসেন।

তিনি বলেছেন, বুধবার বেলা ১১টার দিকে তিন নম্বর ফেরিঘাটে শাহ পরান নামের রোরো ফেরিটি ভিড়লে নামার সময় যাত্রীদের চাপে আনছার মাদবর নামের এক কিশোর যাত্রীদের চাপে অসুস্থ হয়ে ফেরির পন্টুনেই মারা যায়। তার বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কালিকা প্রসাদ গ্রামে।

অন্যদিকে এনায়েতপুরী ফেরিতে দুপুর দেড়টার দিকে বাংলাবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ফেরি ছাড়ার সময় পন্টুনে কিছু যাত্রী দাঁড়ানো ছিলেন। পন্টুন উঠানোর সময় এটি খাড়া হয়ে গেলে তারা অন্য যাত্রীদের মধ্যে পড়ে যান। এসময় হুড়োহুড়ি ও গরমে তারা মারা যান বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফেরিটি বাংলাবাজারে পৌঁছালে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সারাদেশে বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস। এরপরও ঈদের ছুটিতে কর্মজীবী মানুষেরা পায়ে হেঁটে, অধিক ভাড়া দিয়ে, পিকআপ ভ্যান, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে ঢাকা থেকে নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন।

উত্তরবঙ্গগামী ঘরে ফেরা মানুষের ঢল নেমেছে মহাসড়কে। বৈশাখ মাসের খরতাপে খোলা আকাশের নীচে ট্রাক যোগে বাড়ি ফেরা মানুষগুলো যানজটের কবলে পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছেন মহাসড়কেই। তারপরেও ক্লান্তির ছাপ নেই তাদের চোখে মুখে। প্রিয়জনের কাছে ফেরার আনন্দে এত কষ্ট তাদের কাছে কিছুই মনে হচ্ছে না। বগুড়া-ঢাকা, বগুড়া-রংপুর মহাসড়ক ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে।

ঘরমুখো মানুষের স্রোত ঠেকাতে রাজধানীর আশপাশের প্রবেশদ্বারগুলোতে বসানো হয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। তবে চেকপোস্ট বসিয়েও ঘরমুখো মানুষদের ঠেকানো যাচ্ছে না।

চেকপোস্টে পিকআপ ভ্যান ও মাইক্রোবাসে যাত্রীদের নামিয়ে গাড়ি ফেরত পাঠালেও মানুষ কিছুদূর হেঁটে গিয়ে অন্য কোনো ব্যবস্থায় ছুটছেন গ্রামের বাড়িতে। এতে যেমন সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে, তেমনি করোনার সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খুব বেদনামথিত হৃদয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আছে। মানুষ যেভাবে বাড়িতে গেল, তাতে আমরা খুবই মর্মাহত হলাম। সরকার তো চেষ্টা করেছে মানুষকে সুরক্ষিত রাখার। সে জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু মানুষ সেই সুরক্ষা মানল না। চলে গেল যে যেমনে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :