জামালগঞ্জে করোনায় গৃহবন্দী শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে

কালনী ভিউকালনী ভিউ
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১১:১৩ PM, ২৩ এপ্রিল ২০২১

মো.ওয়ালী উল্লাহ সরকার,জামালগঞ্জ প্রতিনিধি::

সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলায় করোনা ভাইরাসের কারণে প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার কারণে অনেক শিক্ষার্থীদের মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।

অনেক অভিভাবকেরাই জানিয়েছেন, দীর্ঘ বন্ধের এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন তাদের ঘটিত মানসিক বিকাশের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে অন্যদিকে নিয়মতান্ত্রিক জীবন থেকে সরে যাওয়ায় মানসিক বিকাশে ব্যাঘাত ঘটছে। করোনা মহামারীর কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর দফায় দফায় প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। সব শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, আগামী ২২ মে পর্যন্ত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। এর মধ্যে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা করছে। এই অনলাইন ক্লাসের কারণে শিশুদের মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তি বাড়ছে।

অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় সন্তানদের আচরণগত নানা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকে অভিযোগের সুরে বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় সারাক্ষণই বাসায় থাকছে সন্তানেরা। এতে আসক্ত হয়ে পড়েছে মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রতি। পড়াশোনার ক্ষেত্রে মনোযোগ হারাচ্ছে তারা। সারাক্ষণই এদের মাথায় থাকে কখন মোবাইল নিয়ে গেইম খেলবে। পড়াশোনার কথা বললে তারা কোন পাত্তাই দেয় না। কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে পরিচালনা করলেও বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। যার কারণে অনেকটা গৃহবন্দী হয়ে থাকছে শিশুরা।

জামালগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী নৃত্যশিল্পী অস্মিতা রায় মিথিলা বলেন, স্কুল বন্ধ থাকায় আর ঘরে থাকতে ভালো লাগে না। আমরা দ্রুত স্কুলে ফিরে যেতে চাই। বিরক্ত লাগলে ফোন নিয়ে বসে বিভিন্ন গান শুনি ও নৃত্য দেখি। করোনা ভাইরাসে বন্ধের কারণে আমার কয়েকটা নৃত্যের প্রোগ্রাম বাতিল হয়েছে। বাবা-মায়েরা বলছেন, শিশুরা বাসায় থাকলেও নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত নয় তারা। হঠাৎ করে জীবনযাপনের পরিবর্তন শিশুদের মাঝে প্রভাব ফেলছে।

এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সীতোষ কুমার তালুকদার জানান, স্কুল বন্ধে শিশুদের নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত রাখতে হলে তাদের দৈনন্দিন কাজের একটা রুটিন করে দেওয়া যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে সকালে ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রার্থনা, খাবার ও ঘুমানোর সময় বাবা-মায়ের সাথে বিভিন্ন কাজে অংশ নেওয়া এবং পড়াশোনার জন্য একটা সময় বেঁধে দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যে পরিমাণ ক্ষতি হবে তা পুষিয়ে উঠতে বেগ পেতে হবে।

জামালগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিধান ভূষণ চক্রবর্ত্তী বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে প্রায় এক বছরের উপরে বিদ্যালয় বন্ধ আছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ঘরে বন্দী জীবন অতিবাহিত করছে। এতে করে অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশজনিত বিভিন্ন সমস্যা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের উচিত ঘরবন্দী সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। পারিবারিক বিভিন্ন কাজে তাদেরকে সম্পৃক্ত করা। পাঠ্যবই ছাড়াও বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, ধর্মীয় বইসহ বিখ্যাত মনীষিদের জীবন নিয়ে লেখা বই পড়তে উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আগে জীবন তারপর লেখাপড়া।

এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক মো. মুজিবুর রহমান বলেন, আচরণগত পরিবর্তন শিক্ষার্থীদেরকে মহামারী পরবর্তী জীবনেও ওদের খাপ খাইয়ের নিতে অসুবিধার সৃষ্টি করবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোললেও সেখানে অন্য শিক্ষার্থীদের সাথে খাপ খাওয়ানো এবং শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ বজায় রাখা কষ্টকর হবে। বছরের অধিক সময় ধরে শিক্ষার্থীরা যদি একটা রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যায় তারপর যদি আগের মতো অবস্থায় ফিরে যায়, সেখানে তাদের খাপ খাওয়ানো বেগ পেতে হবে। কারণ তারা তখন একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। অনেকেই স্কুল-কলেজে যেতেই চাইবে না। বন্ধুদের সাথে মেলামেশা এবং সামাজিকতার দিক থেকেও এক ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন :